কেমন আছেন?

কল্পনা বনাম বাস্তব জীবন

জীবন ধারণের টুলসগুলো কি কি? অথবা সহজ ভাষায় বেঁচে থাকতে গেলে কি কি লাগে? অক্সিজেন, খাবার, পানি এগুলোই তো তাইনা? কিন্তু স্টাডি তো বলছে আরো ইন্টারেস্টিং কথা! একবেলার খাবার/পানি স্কিপ করলেও ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা সোশ্যাল মিডিয়া "চেকিং" কখনো মিস হচ্ছে না! তারা এটাও বলছে দৈনিক একজন মানুষ গড়ে ১৫০ বার তার ফোন চেক করে!

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এখনের সময়ে কেন এত আলোচনা হচ্ছে? আমি ফেইসবুক চালাচ্ছি, ইন্সটাগ্রামে ছবি দিচ্ছি, স্ন্যাপচ্যাটে প্রতি মুহূর্তে আমার একটিভিটি দিয়ে অন্যকে আপ-টু-ডেট রাখছি অসুবিধা কোথায়? সুবিধা না অসুবিধা এই বিচার না হয় কিছু রিসার্চ দিয়েই তুলে ধরা যাক!

কানাডিয়ান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের একটি রিসার্চে বের হয়ে এসেছে যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের বড় একটা গ্রুপ হচ্ছে ৭-১২ গ্রেডের টিনএজাররা এবং তারা দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় দিয়ে থাকে আর দুঃখজনক হলেও সত্যি এই টিনএজারদের মধ্যেই ডিপ্রেশন, এংজাইটি এবং কখনো কখনো সুইসাইডাল চিন্তাগুলো সবথেকে বেশি দেখা গিয়েছে!

আগে ড্রাইভিং এ এক্সিডেন্টের রেইট বেশি ছিল মানুষ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতো বলে কিন্তু এখনের দিনে সেটা বেশি হয় কারণ মানুষ গাড়ি চালানোর সময় ডিভাইস ইউজ করে দেখে!

আমেরিকার এক দম্পতি নিজেদের ডিভোর্স পেপার ইস্যু হওয়ার সময় নিজের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি টেনে একজন আরেকজনকে বলেছিলেন "আমাদের সম্পর্ক আর জীবনটা হয়তো আরো সুন্দর হতে পারতো যদি আমরা আমাদের সেলফোন বাদ দিয়ে একে অন্যের হাত ধরতাম"...........

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের তাহলে কিভাবে প্রভাবিত করছে? আমাদের ব্রেইন থেকে প্রীতিকর কোন ঘটনায় এক ধরনের কেমিক্যাল সিগন্যালিং মলিক্যুল রিলিজ হয় যেটাকে ডোপামিন বলে এবং এই ডোপামিন আমাদের ভালো অনুভূতি সৃষ্টি করে। আমরা ফেইসবুকে যখন কোন ছবি আপলোড দেই তখন বেশি বেশি লাইক, কমেন্ট আমাদের ব্রেইন থেকে ডোপামিন রিলিজকে স্টিমুলেট করে এবং এই অনুভূতিটা এক সময় এ্যাডিকশনে রূপ নেয় যার জন্য কখনো কোন পোস্টে এক্সপেক্টেড রেসপন্স না পেলে আমাদের অস্থির লাগতে শুরু করে এবং সিভিয়ার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সেটি এংজাইটি এবং ডিপ্রেশনে রূপ নেয়।

আবার অন্যভাবে যদি বলা হয় তাহলে সেটা হলো অন্যের "রিল" লাইফের বাহ্যিক চিত্তাকর্ষক দিকগুলো আমাদের "রিয়্যাল" লাইফের অভ্যন্তরীণ না পাওয়া দিকগুলোর সাথে বারবার তুলনার স্বীকার হচ্ছে আর তাই দিনশেষে নিজেকে সবথেকে বেশি ইউজলেস, আনহ্যাপি মনে হচ্ছে! বিউটি এ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাটের ফিল্টারের আড়ালে বদলে ফেলা অন্যকে দেখে "একচুয়্যাল আমি" বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে নিজের গায়ের রঙ নিয়ে, শরীরের বাড়তি মেদ নিয়ে, মুখে ছড়ানো ছেটানো ব্রণের বিস্তার নিয়ে! কোন কাপলের রেস্টুরেন্টে বসে হ্যাপি ফটো দেখে নিজের দাম্পত্যকে ভীষণ বোরিং লাগছে কিন্তু কে জানে হয়তো সেই কাপলই একে অন্যকে সময় দেওয়া বাদ দিয়ে শুধু ছবি আপলোডেই "ক্ষণিকের" আনন্দ খুজে নিয়েছিল!

প্রতিনিয়ত এভাবেই আমাদের জীবন স্ক্রিন লাইফের তুলনার সম্মুখীন হচ্ছে আর আমরা ভীষণ ভাবে "লো" সেল্ফ এস্টিমে ভুগছি। সোশ্যাল মিডিয়ার দরুণ মেন্টাল হেলথ প্রবলেমগুলো "এপিডেমিক" আকারে দেখা দিচ্ছে!

তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া "কাট-অফ" করাটাই কি সল্যুশন? মাথা ব্যাথায় মাথা কেটে ফেলাটা যেমন কোন প্রতিরোধ নয় তেমনি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে আইসোলেটেড হয়ে যাওয়াটাও কোন ইফেক্টিভ কিছু না। বরং আমাদের গোল হওয়া উচিৎ "পজিটিভ সোশ্যাল মিডিয়া প্র‍্যাকটিস"। মনে রাখতে হবে সোশ্যাল মিডিয়ার ডার্ক সাইডের উদ্ভব হয় মিডিয়ার থেকে না বরং সেটি আসে মানুষের বিহেভিয়ার থেকে!

তাহলে কিভাবে এই সমস্যা দূর করা যাবে? সমস্যা শনাক্ত করাটাই প্রথম সমাধান এবং সেই অনুযায়ী প্রিভেন্টিভ এবং কোপিং স্ট্র‍্যাটেজিস প্রয়োগ করতে হবে।

  •  শুধু ফেইসবুকের দুনিয়া নয় বরং বাইরের দুনিয়ার সাথে বেশি কানেকশন তৈরি করতে হবে কারণ জীবনের বেস্ট অনুভূতিগুলো "ফিল্টার" ছাড়াই আসে
  •  "চ্যুজ লাভ ওভার লাইক"- বন্ধুর ছবিতে একবার ট্যাপ করে লাইকের থেকে বন্ধুর সাথে একসাথে বেরিয়ে পড়া আরো বেশি আনন্দপূর্ণ
  •  সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় সবাই স্কিনি, সুন্দর এবং হ্যাপি- সবাইকে এক কাতারে এভাবে ধরে না নিয়ে বরং চিন্তা করুন প্রত্যেকেই একে অন্যের থেকে "আলাদা" এবং প্রতিটা সুসজ্জিত "অনলাইন" প্রোফাইলের আড়ালে "অফলাইন" জীবনের কষ্টের আর হাহাকারের গল্প লুকিয়ে থাকে
  •  "আনপ্লাগ টু গেইট প্লাগড"- ছোট ছোট মোমেন্ট ক্রিয়েট করুন। ঘুরুন, ছুটে চলুন,উড়ে বেরান!
  •  সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যাবহার করুন ইমপ্যাক্ট তৈরির মাধ্যম হিসেবে, "পারফেক্ট লাইফ" দেখানোর মাধ্যম হিসেবে নয়
  •  নিজের সবটুকুকেই ভালোবাসুন। অন্যের লাইক, কমেন্টের বিচারে নিজের ভ্যালুকে জাজ করবেন না

সবশেষে মহাত্মা গান্ধীর একটি উক্তি তুলে ধরা যাক " Be the change that you want to see in the world"...নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি আর স্বপ্নগুলোকে লালন করুন। মিডিয়া একটা অংশ মাত্র। আপনার নিজ অস্তিত্ব তার থেকেও অনেক বড় কিছু!

fascinated 0 Readers
informed 0 Readers
happy 0 Readers
sad 0 Readers
angry 0 Readers
amused 0 Readers

Appointment

01763438148